আপনি যখন ভাবছেন সমাজকর্মের জনক কে, তখন হয়তো একটি নাম আপনার মনে আসে না সঙ্গে সঙ্গে। কারণ সমাজকর্ম একটি এমন বিষয়, যার জন্ম কোনো একটি দিনে বা কারও একক প্রচেষ্টায় হয়নি। এটি সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত ও পরিপূর্ণ হয়েছে। সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা, সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো, গরীব‑অসহায়দের পাশে দাঁড়ানো — এই সব কিছুর সম্মিলনে গড়ে উঠেছে সমাজকর্ম। তাই, সমাজকর্মের ইতিহাস জানাতে হলে আগে বুঝে নিতে হবে এই পেশার মূল আত্মা।
প্রথমে সমাজকর্ম বলতে বোঝানো হতো দান‑খয়রাত বা দয়া‑পরবশ হয়ে সাহায্য করা। কিন্তু আধুনিক কালে এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক এবং বৈজ্ঞানিক পেশায় রূপান্তরিত হয়েছে। সমাজকর্ম এখন শুধু দরিদ্রের পাশে দাঁড়ানো নয়, বরং সামাজিক অবিচার, শ্রেণিবৈষম্য, লিঙ্গ সমতা এবং অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সক্রিয়ভাবে কাজ করা।
এমন একটি ব্যাপক ও শক্তিশালী কাজের গোড়াপত্তন কে করেছিলেন? কে প্রথম সমাজে গিয়ে বলেছিলেন— “আমরা যদি নিজে না দাঁড়াই, তাহলে অন্য কেউ এসে সমাজ বদলাবে না”? এই প্রশ্ন থেকেই আসে আজকের আলোচনার মূল বিষয়: সমাজকর্মের জনক কে?
এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে আপনাকে যেতে হবে ইতিহাসের পাতায়, জানতে হবে কারা ছিলেন সেই মানুষ, যাঁদের কর্ম ও দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছে সমাজের কাঠামো। আপনি জানতে পারবেন—এটি কেবল একটি নাম নয়, বরং একাধিক ব্যক্তির মিলিত অবদানের ফল। তবে ইতিহাস ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির নিরিখে, কিছু নাম আমাদের সামনে বারবার উঠে আসে, যাঁদের কর্মের পরিধি সমাজকর্মের মূল ভিত তৈরি করেছে।
এখন আপনি প্রস্তুত ইতিহাসের দরজায় পা রাখতে? তাহলে চলুন, সমাজকর্মের আদিরূপ থেকে শুরু করি।
সমাজকর্ম ও আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের ভূমিকা

আপনি যদি সমাজকর্মকে একটি আধুনিক পেশা হিসেবে দেখেন, তাহলে বুঝতে পারবেন এটি সমাজবিজ্ঞানের একটি শাখা হিসেবেই গড়ে উঠেছে। সমাজকর্ম শুধুমাত্র সহানুভূতির উপর নির্ভরশীল নয়; বরং এটি একটি বিশ্লেষণধর্মী এবং গঠনমূলক প্রক্রিয়া, যা সমাজে ভারসাম্য আনতে সাহায্য করে।
সমাজবিজ্ঞানের মতো সমাজকর্মও মানুষ এবং সমাজের মধ্যকার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে। তবে সমাজকর্ম সেখানে থেমে যায় না—এটি সমস্যার বাস্তব সমাধানে উদ্যোগ নেয়। এটি একটি প্রয়োগমুখী জ্ঞানের ক্ষেত্র, যেখানে গবেষণার পাশাপাশি বাস্তব জীবনের সমস্যার মুখোমুখি হওয়াই মুখ্য কাজ।
ধরুন কেউ দরিদ্র বা নির্যাতিত—সমাজকর্মী শুধুমাত্র তাকে সহানুভূতি দেখায় না, বরং তার সমস্যা চিহ্নিত করে, সেই অনুযায়ী সামাজিক বা নীতিগত ব্যবস্থা গ্রহণে ভূমিকা রাখে। এই কাজ করতে গেলে সমাজকর্মীদের প্রয়োজন হয় সমাজবিজ্ঞানের জ্ঞান, মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টি এবং নীতিশাস্ত্রের নির্দেশনা।
বিশ্বব্যাপী সমাজকর্ম পেশার বিকাশ ঘটেছে ১৯শ শতকের শেষভাগে এবং ২০শ শতকের শুরুতে। এই সময়েই সমাজে ব্যাপক শিল্পায়ন, আর্থিক বৈষম্য এবং অভিবাসনের ফলে নানান সামাজিক সমস্যা সামনে আসে। এই সমস্যা সমাধানে প্রয়োজন হয় সংগঠিত, প্রাতিষ্ঠানিক সমাজকর্মের।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে সমাজকর্ম একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়, যেখানে নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ, শিক্ষা এবং পেশাগত নীতিমালা নির্ধারণ করা হয়। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে এশিয়া, বিশেষ করে ভারত ও বাংলাদেশে এই পেশার প্রবেশ ঘটে।
এই প্রেক্ষাপটে সমাজকর্মের জনক কে প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে, আপনাকে বুঝতে হবে সমাজকর্ম কীভাবে সমাজবিজ্ঞান থেকে এক স্বতন্ত্র পরিচিতি গড়ে তুলেছে। এটি কেবল একটি পেশা নয়, একটি আদর্শ—যা সমাজকে আরও মানবিক, সহানুভূতিশীল এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তুলতে চায়।
সমাজকর্মের প্রথম অগ্রদূত – যিনি জনক হিসেবে খ্যাত

যখন প্রশ্ন আসে—সমাজকর্মের জনক কে, তখন ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ বলে, এর একক কোনো উত্তর নেই। সমাজকর্মের ভিত্তি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে একাধিক ব্যক্তির অবদান গুরুত্বপূর্ণ হলেও, কিছু নাম সময়ের পরীক্ষায় টিকে গিয়েছে। তাদের মধ্যে দুইটি নাম বিশেষভাবে স্মরণীয়—জেন অ্যাডামস (Jane Addams) এবং ম্যারি এলেন রিচমন্ড (Mary Ellen Richmond)।
জেন অ্যাডামস (Jane Addams)
জেন অ্যাডামস ছিলেন একজন আমেরিকান সমাজকর্মী, যিনি ১৯শ শতকের শেষভাগে সমাজে গরীব, অভিবাসী ও শ্রমিকদের জন্য কাজ শুরু করেন। ১৮৮৯ সালে তিনি “Hull House” নামে একটি কমিউনিটি সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেন শিকাগোতে, যা সমাজকর্মের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত। এখানে তিনি শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, শিশুকল্যাণ এবং আইনি সহায়তা প্রদান করতেন।
জেন অ্যাডামস সমাজকর্মের একটি সমাজভিত্তিক মডেল তৈরি করেন—যেখানে সমাজের প্রত্যেক শ্রেণির মানুষের সঙ্গে একাত্মতা বজায় রেখে পরিবর্তন আনা হয়। তার কাজের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সমতা, মানবতা ও অন্তর্ভুক্তির উপর ভিত্তি করে। এই কার্যক্রম তাকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এনে দেয় এবং ১৯৩১ সালে তিনি শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।
বলা হয়ে থাকে, জেন অ্যাডামস সমাজকর্মের প্রথম নারী নেতা যিনি এই পেশাকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দিয়েছেন। তার দর্শন এবং কর্মপদ্ধতি আধুনিক সমাজকর্ম শিক্ষার ভিত্তি স্থাপন করেছে।
ম্যারি এলেন রিচমন্ড (Mary Ellen Richmond)
অন্যদিকে, ম্যারি এলেন রিচমন্ডের অবদান ছিল ব্যক্তি সমাজকর্মের ক্ষেত্রে। ১৮৯৭ সালে তিনি “Friendly Visitors” প্রোগ্রামের মাধ্যমে একক ব্যক্তি ও পরিবারভিত্তিক সাহায্যের ধারণা তৈরি করেন। তার রচিত ‘Social Diagnosis’ (1917) বইটি সমাজকর্ম শিক্ষার প্রথম প্রামাণ্য বই হিসেবে বিবেচিত হয়। তিনি প্রথম ব্যক্তি সমাজকর্মের জন্য কাঠামোগত নির্দেশনা তৈরি করেন এবং সমস্যাভিত্তিক বিশ্লেষণ পদ্ধতি প্রচলন করেন।
তাঁর কাজ ছিল অনেকটা today’s case management‑এর পূর্বসূরী। ম্যারি এল. রিচমন্ড বিশ্বাস করতেন, সমাজের সমস্যাগুলোকে বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণ করে, মানুষের জীবন মান উন্নত করা সম্ভব।
তাই কেউ যদি প্রশ্ন করেন, সমাজকর্মের জনক কে, তাহলে এর উত্তর হতে পারে—প্রাতিষ্ঠানিক দৃষ্টিকোণ থেকে জেন অ্যাডামস, আর ব্যক্তি‑ভিত্তিক সমাজকর্মের ক্ষেত্রে ম্যারি এলেন রিচমন্ড।
এই দুই নারী সমাজকর্মের দুইটি ভিন্ন ধারা সৃষ্টি করেছিলেন, যা আজও বিশ্বব্যাপী পেশাগত সমাজকর্মের মূল ভিত্তি।
আর্থ‑সামাজিক প্রেক্ষাপটে “জনক” ট্যাগ
আপনি যখন ভাবেন সমাজকর্মের জনক কে, তখন এই প্রশ্নটির উত্তর নির্ভর করে আপনি কোন প্রেক্ষাপট থেকে দেখছেন তা উপর। ইতিহাস, অঞ্চল, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং কাজের ধরন অনুযায়ী একেক সময় একেক ব্যক্তিকে সমাজকর্মের জনক হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তাই এটি কেবল একটি নামের প্রশ্ন নয়—বরং এর পেছনে রয়েছে আর্থ‑সামাজিক বাস্তবতা, সময়ের প্রেক্ষাপট এবং সমাজের চাহিদা।
উদাহরণস্বরূপ, জেন অ্যাডামস এবং ম্যারি রিচমন্ড দুজনই আলাদা পদ্ধতিতে সমাজকর্ম গড়ে তুলেছিলেন। জেন অ্যাডামস তৈরি করেছিলেন সমাজকেন্দ্রিক এবং কমিউনিটি‑ভিত্তিক কাজের এক দৃষ্টান্ত। তিনি গরীব মানুষের পাশে দাঁড়ানো, শিশুদের শিক্ষা, অভিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করেছেন। তার Hull House ছিল সমাজ পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দু। তার এই কমিউনিটি ও হিউম্যান রাইটস ভিত্তিক কাজ তাকে জনক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে বিশেষ করে সমাজের কাঠামোগত সমস্যাগুলোর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কারণে।
অন্যদিকে, ম্যারি রিচমন্ড ছিলেন সংগঠিত সমাজকর্মের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকারী। তিনি ব্যক্তি পর্যায়ে সমস্যা নির্ধারণ, রোগ‑নির্ণয়ের মতো সমাজের অসাম্য বিশ্লেষণ এবং কেস ম্যানেজমেন্টের ভিত্তি রচনা করেছিলেন। তার লেখা বই ‘Social Diagnosis’ সামাজিক সমস্যার গভীরে প্রবেশ করে সেগুলোর যথার্থ সমাধান খোঁজার প্রক্রিয়া তৈরি করে দেয়। তার অবদান পেশাগত সমাজকর্মে ছিল বিপ্লবাত্মক।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
সমাজকর্মের জনক হিসেবে কেন জেন অ্যাডামসকে বেশি উল্লেখ করা হয়?
জেন অ্যাডামসকে সমাজকর্মের জনক হিসেবে বেশি উল্লেখ করা হয় কারণ তিনি সমাজে প্রথম সাংগঠনিকভাবে গরীব, শ্রমিক, অভিবাসী এবং নারীদের অধিকার নিয়ে কাজ শুরু করেন।
ম্যারি রিচমন্ডের অবদান কীভাবে ভিন্ন ও গুরুত্বপূর্ন?
ম্যারি এলেন রিচমন্ড সমাজকর্মকে ব্যক্তিগত ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির মাধ্যমে এগিয়ে নিয়েছেন। তিনি প্রথমবারের মতো ব্যক্তি সমাজকর্মের কাঠামো তৈরি করেন এবং প্রত্যেক ব্যক্তির সমস্যা নির্ণয় করে, তার চাহিদাভিত্তিক সমাধান খোঁজার ব্যবস্থা করেন।
বাংলাদেশ বা ভারতীয় প্রেক্ষাপটে “সমাজকর্মের জনক” কে বলা যায়?
বাংলাদেশ বা ভারতের প্রেক্ষাপটে “সমাজকর্মের জনক” হিসেবে যিনি উল্লেখযোগ্য, তিনি হলেন ড. গুরুজারী দত্ত (Dr. Guruswamy Doraiswamy)।
সমাজকর্ম কি কেবল দরিদ্রদের সাহায্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ?
না, সমাজকর্ম কেবল দরিদ্রদের সাহায্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি পেশাগত এবং নৈতিক দায়িত্ব যেখানে সমাজের সব শ্রেণির মানুষের জন্য সমতা, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের প্রতিষ্ঠা গুরুত্বপূর্ণ। সমাজকর্মীরা পরিবার, শিশু, নারী, প্রবীণ, প্রতিবন্ধী এবং মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্যও কাজ করেন।
সমাজকর্ম কি শুধুই এনজিও-ভিত্তিক পেশা?
না, সমাজকর্ম শুধু এনজিও-ভিত্তিক পেশা নয়। এটি সরকারি, বেসরকারি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যখাত, আদালত, পুনর্বাসন কেন্দ্রসহ নানা প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সমাজকর্মের প্রভাব সমাজনীতি, শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নেও রয়েছে।
উপসংহার
এখন আপনি বুঝতে পারছেন, সমাজকর্মের জনক কে—এই প্রশ্নের উত্তর একমাত্রিক নয়। সমাজকর্মের ইতিহাস বহু মানুষের অবদান, চিন্তা ও চর্চার সমন্বয়ে গঠিত। তবে, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে জেন অ্যাডামসকে সমাজকর্মের ‘মাদার’ বা জনক হিসেবে বেশি স্বীকৃতি দেওয়া হয় তাঁর সমাজভিত্তিক উদ্যোগ এবং বাস্তব প্রভাবের কারণে। পাশাপাশি, ম্যারি এলেন রিচমন্ড সমাজকর্মের কাঠামো তৈরি করে পেশাগত দিকটি মজবুত করেছেন।
আপনি যদি সমাজকর্মে আগ্রহী হন, তাহলে এই ইতিহাস জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটা কেবল আপনাকে অনুপ্রাণিতই করবে না, বরং সমাজের প্রতি আপনার দায়িত্ববোধকে আরও শক্তিশালী করবে। সমাজকর্ম কখনও শুধুমাত্র সহানুভূতির জায়গা নয়, এটি একটি সচেতন, দায়িত্বশীল এবং বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া যা সমাজকে আরও ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক করে গড়ে তুলতে চায়।
তাই, সমাজকর্মের প্রকৃত মানে বুঝতে হলে আপনাকে ফিরতে হবে তার শেকড়ে—সেই মানুষদের কাছে, যারা সমাজের পাশে দাঁড়িয়েছেন যখন কেউ দাঁড়ায়নি। এবং তাদের উত্তরাধিকারকে সম্মান জানিয়ে, আপনার হাতেও সমাজ বদলের সেই শক্তি গড়ে উঠতে পারে।
